শখের বশে শুরু করেছিলেন নার্সারি। সেই শখই এখন তার আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। মাদারীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা কবির হোসেন খান দুই একর ২০ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন একটি সমৃদ্ধ নার্সারি ও আম বাগান। প্রতি বছর শুধু আম বিক্রি করেই তিনি আয় করেন প্রায় ১০ লাখ টাকা। পাশাপাশি ফুল ও সবজি বিক্রি করে আরও প্রায় ৩ লাখ টাকা আয় করেন। তার এই উদ্যোগ দেখে স্থানীয় অনেক তরুণও আম বাগান গড়ে তোলার ব্যাপারে উৎসাহিত হচ্ছেন।
জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার বকুলতলা এলাকার মৃত জয়নাল আবেদিন খানের ছেলে কবির হোসেন খান ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তার এই আগ্রহের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন মা মৃত মাজেদা বেগম। বাড়ির উঠানে ফাঁকা জায়গা পেলেই তিনি বিভিন্ন গাছ লাগাতেন। মায়ের সেই অভ্যাস দেখে কবির হোসেনের মধ্যেও গাছের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয় এবং একসময় বড় একটি নার্সারি গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন।
নিজস্ব বড় পরিসরের জমি না থাকায় তিনি সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের তীরবর্তী একটি জমি লিজ নেন। ২০১৬ সালে ১৫ বছরের জন্য লিজ নেওয়া ওই দুই একর ২০ শতাংশ জমিতে আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ধরনের ফল, ফুল ও সবজির গাছ রোপণ করেন। ধীরে ধীরে তার বাগানটি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে নার্সারিটিতে ১০ প্রজাতির আমগাছ, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা ধরনের ফলজ গাছ রয়েছে। এছাড়া ২০ প্রজাতির ফুলগাছ এবং ১০ প্রজাতির সবজি চাষ করা হচ্ছে। ক্যাকটাসের প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি আলাদা একটি ‘ক্যাকটাস কর্নার’ও গড়ে তুলেছেন। সেখানে প্রায় ২৫ প্রজাতির ক্যাকটাস রয়েছে। আপাতত তিনি ক্যাকটাস বিক্রি করছেন না; বরং বীজ সংগ্রহের মাধ্যমে এর সংখ্যা বাড়াচ্ছেন। ভবিষ্যতে এগুলোও বাজারজাত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফল ও ফুলের পাশাপাশি নার্সারিতে বিষমুক্ত ঢেঁড়স, কচু, লতি, ডাঁটাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিও উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে তার নার্সারিতে পাঁচজন কর্মচারী নিয়মিত কাজ করেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরে নিজেও সন্তুষ্ট কবির হোসেন খান।
কবির হোসেন জানান, প্রতি মৌসুমে তিনি অন্তত ১০ লাখ টাকার আম বিক্রি করেন। এছাড়া ফুল ও সবজি বিক্রি করে বছরে আরও প্রায় ৩ লাখ টাকা আয় হয়। তার বাগানের আমে কোনো ধরনের ফরমালিন ব্যবহার করা হয় না। এ কারণে মাদারীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও ক্রেতারা এখানে আম কিনতে আসেন। অনেকেই বাগানে গিয়ে নিজ হাতে পছন্দের আম পেড়ে কেনেন। ফলে তার বাগানের সুনাম ইতোমধ্যে জেলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
আম কিনতে আসা তামিম আদনান বলেন, বাজারের অনেক আমে রাসায়নিক বা ফরমালিন ব্যবহারের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু কবির হোসেনের বাগানের আম নিরাপদ ও সুস্বাদু। তাছাড়া তিনি প্রজাতিভেদে প্রতি কেজি আম ৭০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করেন। তাই প্রতি বছর পরিবারের জন্য এখান থেকেই আম কিনি।
ফুলগাছ কিনতে আসা রকিব হাসান বলেন, আমি প্রায়ই এখান থেকে গাছ কিনি। বাসার ছাদে বাগান করেছি। তার বিশাল আম বাগান দেখে আমিও আমার গ্রামের বাড়ির খালি জায়গায় আম বাগান করার পরিকল্পনা করছি। গাছ মানুষ ও পরিবেশের বন্ধু, তাই এমন উদ্যোগ সবাইকে অনুপ্রাণিত করে।
কবির হোসেন খান বলেন, শখের বশেই নার্সারিটি গড়ে তুলেছিলাম। জায়গাটি বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় শুরুতে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে বাগানটি বড় হয়েছে এবং এখন এটি আমার জীবনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। এতটা সফল হবো, কখনও ভাবিনি। আমাকে দেখে অনেক যুবক আম বাগান করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। শখের পাশাপাশি এই বাগান এখন আমার আয়ের উৎস এবং পাঁচজন মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যম। একটি বাগান পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই বাগানকে ঘিরে আমার আরও অনেক স্বপ্ন রয়েছে।
মাদারীপুর সদর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আল-আমিন বলেন, কবির হোসেন প্রতি বছর আম বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন, যা অন্যদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। শহরের কাছেই গড়ে ওঠা তার এই বাগান জেলায় ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা তাকে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে থাকি। তাকে দেখে অনেকেই এখন আম বাগান করার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
এসআর শফিক স্বপন, মাদারীপুর