🏠︎ » সারাদেশ » ময়মনসিংহ » নেত্রকোণায় পানির গ্রাস: ৯ হাজার হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে কৃষকের কান্না

নেত্রকোণায় পানির গ্রাস: ৯ হাজার হেক্টর বোরো ধান তলিয়ে কৃষকের কান্না

নেত্রকোণায় টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে জেলার হাওরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে প্রায় ৯ হাজার ৪৩৪ হেক্টর বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। আবহাওয়ার বৈরিতায় বর্তমানে কৃষকদের দুর্ভোগের অন্ত নেই।

জেলার কৃষকরা বলছেন, অতিবৃষ্টির কারণে জমিতে পানি উঠে ধান তলিয়ে গেছে। এমন দুর্যোগের বছর আগে কখনো দেখেননি তারা।
এছাড়া বজ্রপাতের ভয়ে কৃষকরা হাওরে নামতে ভয় পাচ্ছেন। এরমধ্যে দেখা দিয়েছে শ্রমিক ও ধান কাটার মেশিন সংকট। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে জীবনঝুঁকি নিয়েই পানিতে নেমে ধান কাটছেন।

নেত্রকোণার খালিয়াজুড়ি, মদন,মোহনগঞ্জ,আটপাড়া, কলমাকান্দার হাওরাঞ্চলের কৃষকদের চরম দুরবস্থার চিত্র দেখা গেছে। এছাড়া দুর্গাপুর ও বারহাট্টা উপজেলার বিল এলাকা এবং নিচু জমিগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে।

জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওর,আটপাড়া উপজেলার সুমাইখালী ও মদন উপজেলার গণেশের হাওরসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা এখন কোমর পানিতে নেমে তাদের ফসল রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। বজ্রপাতের আশঙ্কায় অনেক শ্রমিক মাঠে যেতে না চাওয়ায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে পরিবারের স্কুলপড়ুয়া শিশু ও নারীদের নিয়ে ধান কাটছেন।

খালিয়াজুরি উপজেলার বল্লী গ্রামের হাওরপাড়ের কৃষক আবুল মিয়া বলেন, ধান পুরোপুরি পেকে গেছে। কিন্তু বৃষ্টি থামছে না। বাঁধ ভেঙে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে। সারা বছরের একমাত্র ফসল যেকোনো সময় পানিতে চলে যেতে পারে।

আটপাড়ার সুমাইখালী হাওরে ধান কাটতে আসা বৃদ্ধা ফিরোজা বেগম বলেন, নদী আর বৃষ্টির পানিতে হাওর ডুবে গেছে। তিন ছেলেকে নিয়ে মাঠে নেমেছি। ধান পুরোপুরি পাকে নাই, তবুও যতটুকু পারি কেটে নিয়ে যাচ্ছি। না নিলে সারা বছর খাব কী?

মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাপোতা হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা কেউ হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন, কেউবা কাটা ধান নৌকায় তুলে উঁচু জায়গায় নিচ্ছেন। আকাশে মেঘ জমলেই কাজের গতি বেড়ে যায় তাদের। ধানক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় ও ডিজেল সংকটে দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।

মোহনগঞ্জ উপজেলার জৈনপুর গ্রামের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, দিন–রাত এক করে ধান কাটছি। শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে গেছে, তবুও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই নিজের জমির ধান কাটতে ব্যস্ত।

এদিকে শ্রমিক সংকটের কারণে মজুরি বেড়ে গেছে অনেক। বর্তমানে একজন শ্রমিকের দৈনিক হাজিরা ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকা বা তার অধিক দিতে হচ্ছে। মোহনগঞ্জের মল্লিকপুর গ্রামের কৃষক মানিক তালুকদার বলেন, অধিক খরচে ধান কাটলেও সঠিক বাজার মূল্য পাওয়া নিয়ে সংশয়ে আছি আমরা।

কেন্দুয়া উপজেলার কান্দিউড়া ইউনিয়নের উগারিয়া হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা পানি ভেঙে ধান কাটছেন। স্থানীয় বেজগাতী গ্রামের কৃষক শাহজাহান মিয়া বলেন, কয়েক একর জমিতে বোরো আবাদ করেছি। কিন্তু জমিতে পানি উঠে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। মেশিন পাচ্ছি না, শ্রমিকও পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে নিজেরাই পানিতে নেমে ধান কেটে নৌকায় তুলছি।

জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার ১০ উপজেলায় এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমি। তবে বৃষ্টির পানিতে ইতোমধ্যে ১ হাজার ৭২ হেক্টর জমির বোরো ধান জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত হয়েছে। বাজারমূল্যে যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় তিন কোটি ৭২ লাখ ১৩ হাজার টাকা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির পানিতে এবার হাওরের জমি আক্রান্ত হয়েছে। ফলন ভালো হলেও বৃষ্টির কারণে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ হবে।

নেত্রকোণা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, জেলার ১৩৪টি ছোট-বড় হাওরে আগাম বন্যা রক্ষায় ১৩৮ কিলোমিটার অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঝাঞ্জাইল এলাকায় কংস নদীর পানি এরই মধ্যে বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধনু নদের খালিয়াজুরী পয়েন্টে পানি এখন বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং পানির চাপ বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সতর্ক রাখা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি উজানেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদ নদীর পানি আরো বেড়ে গিয়ে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

মামুন রণবীর, নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ