কক্সবাজার || মহেশখালী|| প্রতিনিধি: কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট গ্যাস সংকট চলতি মাসেও কাটছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টার্মিনালটির মেরামত কাজ শুরু হলেও জুলাইয়ের মধ্যে এটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি অব্যাহত থাকবে।
গত মঙ্গলবার টার্মিনালটিতে আগুন লাগার পর জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও পরিবহন সব খাতেই গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বর্তমানে দেশে আমদানিকৃত এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশনের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, টার্মিনালের বয়লার থেকে বের হওয়া সিগন্যালবাহী বৈদ্যুতিক তারে শর্টসার্কিটের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। বিদেশি প্রকৌশলীরা ইতোমধ্যে মেরামতকাজ শুরু করেছেন। তবে চলতি সপ্তাহ বা জুলাই মাসের মধ্যে টার্মিনালটি সচল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে এর মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে দৈনিক গ্যাস ঘাটতি প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম বেঙ্গল প্রতিদিন-কে বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত মেরামতের কাজ চললেও এটি চালু হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
আবাসিকে চরম ভোগান্তি
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে।
মগবাজারের বাসিন্দা পারভীন আক্তার বলেন, দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। রাতে গ্যাস এলে তখন রান্না করতে হয়।
মোহাম্মদপুরের আদাবরের বাসিন্দা মো. সুমন জানান, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে একটি রান্না শেষ করতেই দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে।
পরিস্থিতির কারণে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার ও ইনডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। এতে মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
তিতাসের সরবরাহও কমেছে
তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বেঙ্গল প্রতিদিন-কে জানান, তিতাসের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট হলেও বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটে। এলএনজি টার্মিনাল সচল না হওয়া পর্যন্ত এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর অধিকাংশ স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
মগবাজারের একটি সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক মো. আল আমিন বলেন, অধিকাংশ স্টেশনেই পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে গ্যাস আছে, সেখানেও চাপ কম হওয়ায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আরেক চালক মো. কাউছার বলেন, প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস না পাওয়ায় দৈনিক ট্রিপ কমে গেছে, ফলে আয়ও কমে যাচ্ছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরামর্শ
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমদানিনির্ভরতার কারণে এ ধরনের সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। তারা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বেঙ্গল প্রতিদিন-কে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। দেশে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র থাকলেও আমদানির ওপর বেশি নির্ভরতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নতুন কূপ খননের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এটি আরও আগে নেওয়া হলে সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব হতো।