নাটোরের উত্তরা গণভবন-এর প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের এক বিস্ময়কর সাক্ষী— প্রায় ২০০ বছর পুরোনো একটি বিশাল যান্ত্রিক ঘড়ি। বিদ্যুৎ, ব্যাটারি বা আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই এখনও সচল রয়েছে এই ঐতিহাসিক ঘড়ি।
প্রায় ১৩ মণ ওজনের ডাবল ডায়াল ঘড়িটি এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যাতে ফটকের দুই দিক থেকেই সহজে সময় দেখা যায়। শুধু সময় জানানোর কাজই নয়, এর ঘণ্টাধ্বনি কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এক সময় এই ঘণ্টাধ্বনির ওপর নির্ভর করেই আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবন চলত। এখনও অনেক মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে ঘণ্টাধ্বনি শোনার জন্য উত্তরা গণভবনের আশপাশে এসে অপেক্ষা করেন।
ঘড়িটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর চালানোর পদ্ধতি। এটি সম্পূর্ণভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এক পাশে আট মণ এবং অন্য পাশে পাঁচ মণ ওজনের দুটি পাথরের ভার ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে, আর সেই শক্তিতেই সচল থাকে ঘড়ির কাঁটা। একবার চাবি দিলে টানা সাত দিন পর্যন্ত চলতে পারে এই ঘড়ি।
উত্তরা গণভবনের তত্ত্বাবধায়ক নুর মোহাম্মদ জানান, প্রতি সপ্তাহে একবার ঘড়িতে চাবি দিতে হয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এখনও এর যান্ত্রিক অংশ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে নাটোর রাজবাড়ির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর রাজা প্রমোদনাথ রায় রাজপ্রাসাদ পুনর্নির্মাণ করেন। সে সময় ইউরোপ থেকে বিশেষভাবে এই ঘড়িটি আনা হয়। ধারণা করা হয়, এটি ইংল্যান্ড অথবা ফ্লোরেন্স থেকে আনা হয়েছিল।
স্থানীয়দের মতে, উপমহাদেশে এ ধরনের যান্ত্রিক ডাবল ডায়াল ঘড়ি অত্যন্ত বিরল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এখনও এটি সময় জানিয়ে যাচ্ছে।
ঘড়িটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে গণপূর্ত বিভাগ। যান্ত্রিক অংশ সচল রাখতে বিশেষভাবে রাইফেলের তেল ব্যবহার করা হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ে চাবি না দেওয়ায় বর্তমানে মূল সময়ের সঙ্গে ঘড়ির সময়ে কয়েক মিনিটের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
উত্তরা গণভবনে ঘুরতে আসা অনেক দর্শনার্থী জানান, দুপুর ১২টার সময় ১২ বার ঘণ্টাধ্বনি শোনার অভিজ্ঞতা এখনও তাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় এই ঘণ্টাধ্বনি সাত-আট মাইল দূর থেকেও শোনা যেত।
নাটোরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া