বর্তমান সময়কে অনেকেই আখ্যা দিচ্ছেন “ফিতনার যুগ” হিসেবে—একটি এমন অস্থিরতা, যেখানে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ঝাপসা হয়ে গেছে, দুর্বল হয়েছে নৈতিকতা, চিন্তায় ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি এবং মানুষ হারাচ্ছে আস্থা। সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি স্তর যেন নানা ধরণের ফিতনার চ্যালেঞ্জে ঘেরা। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সামনে এসেছে দৃঢ় ঈমান।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, ফিতনা এমন একটি সূক্ষ্ম ফাঁদ, যা ধীরে ধীরে হৃদয়ে ঢোকে—কখনো ভুল পথের প্রলোভনে, কখনো পরিবেশের নষ্ট প্রভাব, আবার কখনো শয়তানের কৌশলী কুমন্ত্রণায়। বিপদের বিষয় হলো, বেশির ভাগ মানুষ সময়মতো বুঝতেই পারেন না যে তিনি ফিতনার মধ্যে ঢুকে পড়েছেন।
ফিতনার সময়ে ঈমান এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে—ফিতনার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রথম ও প্রধান উপায় হলো ঈমানকে শক্ত করা।
কোরআনে বলা হয়েছে—আল্লাহ মানুষ এবং তার হৃদয়ের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ান, অর্থাৎ ঈমান টিকিয়ে রাখা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। আবার সতর্ক করা হয়েছে, ফিতনার আগুন শুধু পাপীকে নয়—পুরো সমাজকে গ্রাস করতে সক্ষম।
মাওলানা শরিফ হাসান শাহীন বলেন, ঈমানই সেই আলো যা অন্ধকার সময়েও পথ দেখায়। ঈমান দুর্বল হলে হৃদয়ে ফিতনার কালো দাগ জমে; শক্ত হলে তা শয়তানের কুমন্ত্রণা প্রতিহত করে।
হাদিসে ফিতনার সতর্কতা
রাসুল (সা.) ফিতনার সময় শান্ত থাকা, বুঝে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন,
“ফিতনা মানুষের হৃদয়ে একের পর এক প্রবেশ করবে; যে গ্রহণ করবে, তার হৃদয় কালো হয়ে যাবে।”
এ থেকে বোঝা যায়—দুর্বল ঈমানের হৃদয় দ্রুত বিভ্রান্ত হয়, আর শক্ত ঈমান প্রতিটি ফাঁদ চিনে নেয়।
ফিতনা থেকে রক্ষার ছয় মূল উপায়
বিশেষজ্ঞরা ঈমানকে দৃঢ় করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় উল্লেখ করেছেন—
1️⃣ আল্লাহর জিকিরে স্থির থাকা
জিকির হৃদয়ে প্রশান্তি আনে, ভয় দূর করে এবং শয়তানের প্রভাব কমায়।
2️⃣ নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও বুঝে পড়া
কোরআনকে বলা হয়েছে “আল্লাহর দড়ি”—যে আঁকড়ে ধরে, ফিতনার ঝড় তাকে ভাঙতে পারে না।
3️⃣ সালাত প্রতিষ্ঠা করা
নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে—যা ফিতনার প্রধান উৎস।
4️⃣ নিজের আকিদা ও বিশ্বাস পরিশুদ্ধ করা
ভুল মতবাদ ও বিভ্রান্তি ঠেকানোর জন্য সঠিক বিশ্বাস জানা অপরিহার্য।
5️⃣ ভালো সঙ্গ নির্বাচন করা
মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর থাকে। তাই ভালো সঙ্গ ঈমানকে শক্ত করে; খারাপ সঙ্গ ফিতনায় ফেলতে পারে।
6️⃣ হিংসা, রাগ, গিবত—অভ্যন্তরীণ ফিতনা থেকে বাঁচা
এগুলো হৃদয়কে দুর্বল করে এবং তাতে সহজে বিভ্রান্তি ঢুকে পড়ে।
ফিতনার সময় আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া অপরিহার্য
রাসুল (সা.)-এর দোয়া—
“হে অন্তরের মালিক! আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনে স্থির রাখো।”
এই দোয়া শেখায়—ফিতনা দমন করতে সবচেয়ে প্রয়োজন আল্লাহর সাহায্য ও শক্তিশালী ঈমান।
শেষ কথা
যত পরিকল্পনাই নেওয়া হোক, মূল সুরক্ষা হলো হৃদয়ের ভেতরের শক্তি—ঈমান। দৃঢ় ঈমানই ফিতনার অন্ধকারে পথ দেখায়, শয়তানের ফাঁদ থেকে রক্ষা করে এবং মানুষকে সঠিক পথে অটল রাখে।
ইসলামি শিক্ষার সারমর্ম পরিষ্কার—
ঈমান দৃঢ় করো, তাহলেই ফিতনা তোমাকে ভাঙতে পারবে না।