সাম্প্রতিক একটি ভূমিকম্প মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও ঢাকার মানুষ যে আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল, তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এই ঘটনাটি কেবল ভূমিকম্প নয়—বরং এক ধরনের “ভীতিকম্প” হিসেবে দেখা দিয়েছে, যেখানে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া বাস্তব ঝুঁকির চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ছিল।
এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম উল্লেখ করেন ফ্রাঙ্ক ফারান্ডারের বই “দ্য ফিয়ার প্যারাডক্স”। তিনি বলেন, আধুনিক সমাজে নিরাপত্তার প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণই মানুষকে আরও দুর্বল, উদ্বিগ্ন ও সহজেই প্রভাবিত হওয়ার মতো অবস্থায় নিয়ে গেছে। ঢাকার ভূকম্প-পরবর্তী আচরণ যেন সেই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ।
কেন বাড়ছে আমাদের ভয়?
মানবমস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ বিপদের মুহূর্তে দ্রুত সতর্ক সংকেত দেয়। কিন্তু বাস্তব বিপদ কমে গেলেও আমাদের মস্তিষ্ক এখন সংবাদ, ভিডিও, গুজব, এমনকি ভয়েস নোটের প্রতিক্রিয়ায়ও একইভাবে সক্রিয় হয়। ফলে ছোট একটি কম্পনও বড় বিপদের ধারণা তৈরি করে।
অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী চাপ মানসিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রকে দুর্বল করে দেয়—ফলে ভয় কাটতে সময় লাগে এবং সামান্য ঘটনা থেকেও উদ্ভূত হয় অতিরিক্ত আতঙ্ক।
ভয় ছড়ানোর তিন প্রধান পথ
বাংলাদেশে ভয় দ্রুত ছড়ায় তিনটি কারণে—
- সংবাদমাধ্যমের অতিপ্রতিযোগিতা, যেখানে ক্লিক পাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয় ভয়াবহ শিরোনাম।
- সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদম, যা উত্তেজনাপূর্ণ ও আতঙ্কজনক কন্টেন্টকে অগ্রাধিকার দেয়।
- সমষ্টিগত মানসিক স্মৃতি, যেখানে অতীত দুর্যোগের ভয় নতুন ঘটনায় দ্রুত ফিরে আসে।
এ কারণে সামান্য কম্পনও “বড় ভূমিকম্প আসছে” ধরনের গুজবে রূপ নেয় এবং মানুষের উদ্বেগ বেড়ে যায়।
অতিরিক্ত ভয় যে ক্ষতি করে
ভয়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণহীন হলে আচরণ অরাজক হয়ে ওঠে। হুড়োহুড়ি, ভুল সিদ্ধান্ত, ভিড় তৈরি—এসবের মাধ্যমে আঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।
এ ছাড়া–
- দীর্ঘ দুশ্চিন্তা মানসিক শান্তি নষ্ট করে,
- উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ায়,
- মানুষ বিচক্ষণতা হারায়,
- গুজব-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত সমাজকে বিভ্রান্ত করে।
ভয়কে কাজে লাগিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করাও তখন সহজ হয়, যা সামাজিক স্থিতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
কীভাবে ভাঙা যাবে এই ‘ভীতিকম্প’ চক্র?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয়কে দমন নয়—সমঝে মোকাবিলা করাই জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন—
- বিজ্ঞাননির্ভর ও দ্রুত সরকারি বার্তা,
- মিডিয়ার জন্য সংকট-সংবাদসংক্রান্ত নীতি,
- ডিজিটাল সচেতনতা ও আবেগ-শিক্ষা,
- স্কুল–কমিউনিটিতে ভূমিকম্প প্রস্তুতি মহড়া,
- বিশ্বস্ত নেতৃত্বের সক্রিয় ভূমিকা,
- মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজপ্রাপ্ত করা।
সর্বোপরি, “ঝুঁকি শূন্য” জীবন বলে কিছু নেই—এটি মেনে নিতেই হবে। কোনটা বাস্তব বিপদ, আর কোনটা গুজব-নির্ভর ভয়—এটা চিহ্নিত করার ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
শেষ কথা
ফারান্ডারের তত্ত্ব অনুযায়ী, যে সমাজ সবসময় বিপদমুক্ত থাকতে চায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত ভয়কে স্থায়ী সঙ্গী বানিয়ে ফেলে। বাংলাদেশ ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
ভূমিকম্প আসবে—এটাই প্রকৃতি। কিন্তু ভয়কে যদি আমরা নিজেদের সামাজিক ‘ফল্ট লাইন’ বানিয়ে ফেলি, তবে বিপদের বড় অংশ তৈরি হবে আমাদেরই হাতে, প্রকৃতির হাতে নয়।