মাত্র ১৪ বছর বয়সে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন বাবু মিয়া। এরপর সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া হয়ে দীর্ঘ ১০ বছরের ইরাক অধ্যায়—কোথাও স্বপ্নের সাফল্য মিলেনি। বহু বছরের প্রবাস জীবনের নানা চড়াই–উতরাই শেষে একসময় সিদ্ধান্ত নেন, আর বিদেশ নয়—নিজের গ্রামেই কিছু করবেন। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পুরো জীবন।
রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার গৌরাঙ্গপুর গ্রামে ফিরে বাবু মিয়া প্রথমে মাত্র তিনটি গাভি দিয়ে ছোট খামার শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই খামারটি বড় পরিসরে দাঁড়ায়। তবে করোনাকালে দুধের দাম পড়ে গিয়ে বড় লোকসানের মুখে পড়েন। বাধ্য হয়ে গাভিগুলো বিক্রি করে কিছুদিন খামার বন্ধও রাখেন।
কিন্তু হাল না ছেড়ে নতুন করে মন দেন ষাঁড় পালনে। এবার শুরু হয় তাঁর সাফল্যের প্রকৃত যাত্রা।
৩০টিরও বেশি দামি ষাঁড়—ওজন ৫০০ থেকে ১,০০০ কেজি
খুব যত্ন করে তিনি সংগ্রহ করতে থাকেন দেশি–বিদেশি উন্নত জাতের বাছুর—ব্রাহামা, জার্সি, শাহিওয়ালসহ আরও বিভিন্ন জাত। বর্তমানে তাঁর ‘তাসফিয়া ডেইরি ফার্মে’ রয়েছে প্রায় ৩০টি মোটা ষাঁড়। যেগুলোর ওজন ৫০০ কেজি থেকে ১ টন পর্যন্ত।
প্রতি কোরবানির মৌসুমে এগুলো বিক্রি করেন তিনি। দাম শুরু হয় ৫ লাখ থেকে, কোনো কোনো ষাঁড় বিক্রি হয় ১৫ লাখ টাকারও বেশি।
নিরাপত্তায় চার বিদেশি কুকুর ও সিসিটিভি
খামারটি রাজবাড়ী–কুষ্টিয়া আঞ্চলিক সড়ক থেকে কয়েক কিলোমিটার ভেতরে। পুরো খামারজুড়ে রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। কিন্তু সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা রক্ষী হলো চার–চারটি বিদেশি কুকুর।
কুকুরগুলো এমনই তৎপর যে লোহার খাঁচায় বন্দি থেকেও অপরিচিত কাউকে দেখলেই তীব্রভাবে ঘেউ ঘেউ শুরু করে। রাতে তারা এক মুহূর্তও ঘুমায় না—পুরো খামার পাহারা দেয় নিয়মিত।
বাবু মিয়া বলেন,
“মানুষ কখনো কখনো বিশ্বাস ভাঙতে পারে, কিন্তু কুকুর কখনো বেইমানি করে না।”
প্রতিদিন কুকুরগুলোর খাবারে খরচ হয় প্রায় ৫০০ টাকা—মুরগির মাংস, ভাত, সবজি—সবই তাদের মেনুতে থাকে।
একাধিক ষাঁড় কিনলে উপহার দেন উন্নত জাতের ছাগল
খামারে রয়েছে বেশ কয়েকটি উন্নত জাতের ছাগলও, যেগুলোর ওজন ৮০–৯০ কেজির মধ্যে। তাঁর বিশেষ উদ্যোগ হলো—
একজন ক্রেতা যদি একাধিক ষাঁড় কিনেন, তবে তিনি উপহার হিসেবে ছাগল দেন।
এই অনন্য মার্কেটিং কৌশল অনেক ক্রেতার নজর কাড়ছে।
প্রতিমাসে ব্যয় দুই লাখ, তবুও সাফল্যের চাবিকাঠি অধ্যবসায়
প্রতিদিন শ্রমিকদের বেতন, খাদ্য, কুকুরের যত্ন, বিদ্যুৎসহ নানা খরচ মিলে মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ টাকা। বছরের শেষে কোরবানির মৌসুমে ষাঁড় বিক্রি করে তিনি লাভ তুলতে সক্ষম হন। তবে লাভের পরিমাণ প্রকাশ করতে চান না বাবু।
খাদ্যের দাম দ্বিগুণ—কঠিন সময় পার করছেন খামারিরা
গমের ভুসি, চালের গুঁড়া, ঘাস—পরিপূর্ণ প্রাকৃতিক খাদ্য দিয়েই বড় করা হয় এসব ষাঁড়। কিন্তু এখন খাদ্যের দাম আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় পরিচালনা ব্যয় বাড়ছে।
বাবু মিয়ার অভিযোগ—প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে কোনো সহায়তা কখনো পাননি। করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায়ও তাঁর নাম ছিল না।
তবে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান—
“আমরা পরামর্শ ও ভ্যাকসিনসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিই। খামারটি ভালো, তাঁর উদ্যোগও প্রশংসনীয়।”
বিদেশ থেকে ফিরে নিজের গ্রামে সফলতার দৃষ্টান্ত
বাবু মিয়ার গল্প শুধু এক খামারের কাহিনি নয়—তা দেশের তরুণদের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা। প্রবাসে দীর্ঘ সংগ্রামের পর নিজ গ্রামে ফিরে পরিশ্রম, পরিকল্পনা এবং ধৈর্যের ওপর ভর করে কীভাবে সফল হওয়া যায়—তারই জীবন্ত উদাহরণ তিনি।