রবিবার, ৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
৩০শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার, ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
🏠︎ » মতামত » নির্বাচনের দিন গণভোট: ভোটার আগ্রহ কতটা বাস্তব?

নির্বাচনের দিন গণভোট: ভোটার আগ্রহ কতটা বাস্তব?

নির্বাচনের দিন গণভোট: ভোটার আগ্রহ কতটা বাস্তব?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে গণভোট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একই দিনে গণভোট আয়োজনের সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক, দ্বিধা আর নানা প্রশ্ন। লক্ষ্য একটাই—জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে জনগণের চূড়ান্ত মতামত জানা। তবে রাজনীতির বাস্তবতা বলছে, এই গণভোট আদৌ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েই বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।


গণভোটে কী জানতে চায় সরকার?

সরকার জারি করা গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী ভোটারদের সামনে একটি মাত্র প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবে। মূলত ওই প্রশ্নের ভেতরেই চারটি বড় সিদ্ধান্ত একসঙ্গে অনুমোদনের বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক হলো—

  • নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার
  • দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন ও উচ্চকক্ষ প্রবর্তন
  • সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি ও বিরোধী দলের শক্ত ভূমিকার নিশ্চয়তা
  • বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিতকরণ

অর্থাৎ ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ দিলে চারটির সবকটিতে সম্মতি জানাতে হবে, আর ‘না’ দিলে সবকিছু একযোগে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এই পদ্ধতিতেই দেখা দিয়েছে দ্বিমত।


প্রশ্ন একটাই, আপত্তি অনেক

বিশ্লেষকদের মতে, আলাদা বিষয়ে আলাদা মত দেওয়ার সুযোগ না রেখে একসঙ্গে সব প্রস্তাবের প্যাকেজ অনুমোদন চাওয়া গণভোটের গণতান্ত্রিক চেতনাকেই কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষণাপত্র ও ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সনদের বিষয়বস্তু যদি সাংঘর্ষিক হয়, তবে বাস্তবায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই অস্পষ্টতার কারণেই অনেকে মনে করছেন—গণভোটের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।


বিএনপি নেই মাঠে

বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট—দলটি গণভোট নিয়ে কোনও প্রচারে যাচ্ছে না। ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’—কোনোটির পক্ষেই তারা ভোটারদের আহ্বান জানাবে না বলেও জানিয়েছে।

এর অর্থ দাঁড়ায়—

  • বিএনপি সমর্থকেরা হয়তো গণভোটের ব্যালট নেবেনই না
  • তাদের বেশিরভাগ ভোট শুধু সংসদ নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে

ফলে গণভোটে ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।


অন্যান্য দলগুলোর অবস্থান

জামায়াতে ইসলামী ও কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। তারা মনে করছে, এই গণভোটের সফলতার ওপরই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

তবে বাস্তবতার বিচারে, শুধুমাত্র কয়েকটি দলের মাঠপর্যায়ের প্রচেষ্টায় জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া সহজ নয়।


অতীতের গণভোট থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশ আগেও তিনবার গণভোটের অভিজ্ঞতা পেয়েছে।

  • ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের গণভোট সামরিক শাসকদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলাফলেও ছিল অবিশ্বাস্য ‘হ্যাঁ’-এর সংখ্যা, কিন্তু রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল ক্ষীণ।
  • ১৯৯১ সালের গণভোট ছিল তুলনামূলকভাবে বিশ্বাসযোগ্য, যেখানে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফেরার পক্ষে জনগণ মত দেয়, যদিও ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৩৫ শতাংশের কিছু বেশি।

ইতিহাস বলছে, ভোটার উপস্থিতি যদি কম হয়, গণভোটের নৈতিক শক্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে, আইনগত বৈধতা থাকলেও।


নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে: ঝুঁকি কোথায়?

একই দিনে দুই ধরনের ব্যালট থাকায় স্বাভাবিকভাবেই ভোটারদের মনোযোগ থাকবে সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের দিকে। ভোট দিতে এসেই অনেকেই হয়তো—

  • কেবল সংসদ ব্যালটেই ভোট দিয়ে চলে যাবেন
  • গণভোট ব্যালট নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেন না

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া গণভোট কার্যত প্রতীকী ইভেন্টে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।


গণভোটের বৈধতা বনাম নৈতিকতা

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, “হ্যাঁ” ভোট “না”-এর চেয়ে বেশি পেলেই গণভোট আইনি বৈধতা পাবে—ভোটার উপস্থিতির ন্যূনতম হার নির্ধারণ করা হয়নি।

কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের যুক্তি—
আইনের বৈধতার পাশাপাশি নৈতিক ও গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ।

ভোটার উপস্থিতি যদি খুব কম হয়, তবে—

  • জনগণের প্রকৃত সম্মতির প্রশ্ন থেকে যাবে
  • গণতন্ত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কা দেখা দেবে

উপসংহার

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোট আয়োজন নিঃসন্দেহে একটি বড় ও সাহসী রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তবে প্রধান বিরোধী দল মাঠে না থাকা, ভোটারদের বিভ্রান্তি, একক প্রশ্নের প্যাকেজ কাঠামো—সব মিলিয়ে গণভোটের সফলতা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

প্রশ্ন এখন একটাই—
নির্বাচনের দিনে ভোটাররা সংসদ ভোটের পাশাপাশি গণভোটেও কি সত্যিই সক্রিয় অংশ নেবেন? নাকি এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হারিয়ে যাবে ব্যালটের ভিড়ে?

গণভোটের প্রকৃত ফল নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সচেতন অংশগ্রহণের ওপরই।

শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

সর্বশেষ