বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে— গণহত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায়ে দণ্ডিত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের কোনো সম্ভাবনা আদৌ আছে কি না?
ইতিহাস বলছে, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কোনো শাসকের ক্ষমতার মসনদে ফিরে আসার উদাহরণ বিশ্বে নেই। বিভিন্ন দেশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৮ জন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান এ ধরনের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩৫ জনের রায় কার্যকর হয়েছে, বাকিরা কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউবা আপিলে দণ্ড লঘু করাতে পেরেছেন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বর্তমানে মোট ৫৮৬টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৩২৪টি হত্যা সংক্রান্ত। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাও রয়েছে। এরই মধ্যে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের পর শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কিংবা সক্রিয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের পথ কার্যত আরও সংকুচিত হয়ে গেছে।
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার পরিস্থিতির একটি তুলনা সামনে আসে। ক্ষমতা হারানোর পর এরশাদ দেশে ছিলেন, আইনগতভাবে মামলা মোকাবিলা করেন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে সক্ষম হন। কিন্তু শেখ হাসিনার পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, তার অনুপস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বও বিদেশে অবস্থান করছে। অধিকাংশ নেতার বিরুদ্ধেই রয়েছে দুর্নীতি ও হত্যার অভিযোগ, যাদের মধ্যে ‘ক্লিন ইমেজ’ নেতৃত্ব গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারের কার্যক্রমের ওপর। যদি নতুন নেতৃত্ব ব্যর্থ হয় কিংবা পূর্বের মতোই অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তবে একটি রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হতে পারে। তবে বয়স, মামলা এবং জনমনে সৃষ্ট নেতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এখন অত্যন্ত ক্ষীণ।
এদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। দলটির কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় সাংগঠনিক তৎপরতা প্রায় স্থবির। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সমর্থন এখন ১৯ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। মাঠ পর্যায়ের নিরাপরাধ নেতাকর্মীদের বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না নেওয়াকে দলটির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে উঠে আসা নতুন শক্তিরাও প্রত্যাশা অনুযায়ী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। ফলে পতিত শক্তি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতেই পারে— এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে স্থানীয় নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ সীমিত পরিসরে সংগঠনের শক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তবে সেটি জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে তাদের পুনরুত্থানের জন্য যথেষ্ট হবে কি না— সেটি এখনো অনিশ্চিত।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের অভিমত স্পষ্ট— জনগণের আস্থা ফেরাতে হলে পুরনো ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শুধু অতীতের বক্তব্য বা ভিক্টিম কার্ড দিয়ে ক্ষমতায় ফেরার আর সুযোগ নেই। জনগণ এখন কথা নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গণহত্যার রায় শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত রাজনীতির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সামগ্রিক ভবিষ্যৎকেও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইতিহাসের নজির অনুযায়ী, দণ্ডিত শাসকের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন নজিরবিহীন— আর সেই বাস্তবতাই আজ শেখ হাসিনার জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।